কোটা সংস্কার আন্দোলনের রূপকার, দৈনিক ইনকিলাবের সিনিয়র সাংবাদিক ও জাতীয় মানবাধিকার সোসাইটির যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ আবদুল অদুদ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে এক অনন্য নাম। তিনি ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি হাইকোর্টে দায়েরকৃত কোটা সংস্কার রিটের সংগঠক ও পিটিশনার। জুলাই বিপ্লবেও ছাত্র-জনতার পক্ষে যার ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। যেহেতু কোটা আন্দোলন থেকেই জুলাই বিপ্লবের সূত্রপাত, সেহেতু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে তাকে মূল্যায়ণের দাবি ছিল বিভিন্ন মহলের।জানা গেছে, ৫৬% কোটার কারণে বিসিএসে বঞ্চিত হয়ে তিনি হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে তার এই দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে বা কোটা সংস্কার আন্দোলনে গণজোয়ার তৈরি করে আন্দোলনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে কোটা সংস্কারের পক্ষে তার তৎকালীন কর্মস্থল দৈনিক আমাদের অর্থনীতিতে শত শত রিপোর্ট প্রকাশ করেন, যার মধ্যে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, ঢাবি অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ড. এএসএম আতীকুর রহমান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, সাবেক এমপি শাম্মী আক্তার, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূরসহ দেশের অনেক বরেণ্য রাজনীতিক-বুদ্ধিজীবির সাক্ষাতকারও রয়েছে। ফলে একসময় আন্দোলনটি গণআন্দোলনে রূপ নেয়, যার নেপথ্য কারিগর হিসেবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন সাংবাদিক মোহাম্মদ আবদুল অদুদ।আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের সব ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া ছাত্রলীগ প্রার্থীকে হারিয়ে ডাকসুতে ভিপি নির্বাচিত হন নুরুল হক নূর। এমনকি ডাকসু নির্বাচন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও মোহাম্মদ আবদুল অদুদের একটি বড় ভূমিকা ছিল, যার প্রমাণও রয়েছে। ঢাবির সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ জাতীয় মানবাধিকার সোসাইটির এক আলোচনা সভায় তার ৩০ সেকেন্ডের প্রশ্নের উত্তর ৩০ মিনিটে দেন তৎকালীন ভিসি ড. আখরুজ্জামান।
ঐতিহাসিক প্রশ্নটি ছিল, আদালতের বাধ্যবাধকতায় কেন, আপনারা শিক্ষক হিসেবে নিজেদের নৈতিক অবস্থান ও দায়বদ্ধতা থেকে কেন ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ নিলেন না? চমকে দেয়া সেই প্রশ্নের উত্তরে সেদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে ডাকসু নির্বাচন থেকে যে ভিসি কোনোক্রমেই সরে যাবেন না, তার ঘোষণা দেন।পরিস্কার কমিটমেন্ট করেন।ফলে ডাকসু নির্বাচন নিশ্চিত হয়। ‘ডাকসু নির্বাচন, আদালতের বাধ্যবাধকতায় কেন?’ শিরোনামে ১৯ সেপ্টেম্বর সাংবাদিক আবদুল অদুদের যৌক্তিক অবস্থান থেকে লেখা ক্ষুরধার একটি কলাম প্রকাশিত হয় আমাদের সময় ডট কম ও আমাদের নতুন সময়ে।মোহাম্মদ আবদুল অদুদ জুলাই বিপ্লবের দিনগুলোতে ছাত্র-জনতার পক্ষে দিন রাত এক করে দেশের তরে কাজ করেছেন, যেন কাঙ্খিত পরিবর্তন আসে। শিক্ষার্থীরা যেমন দেয়ালগুলো রাঙিয়েছিল, তিনিসহ তার সহকর্মীরা তেমনি ছাত্র-জনতার পক্ষে ইনকিলাবের পাতাগুলোকে রাঙিয়েছিলেন। এখনো বিশ্ববরেণ্য অর্থনীতিবিদ, শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সপক্ষে গণমাধ্যমে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন। সংশ্লিষ্টরা সবই জানেন।
মেধা মননে অনন্য প্রতিভার অধিকারী মোহাম্মদ আবদুল অদুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের স্বনামধন্য তিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ত্রিপল মাস্টার্স করেছেন, একটিতে প্রথম স্থানও লাভ করেছেন।তিনি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের মূলধারার সাংবাদিকতায় নিয়োজিত থাকা ইংরেজিতে বিশেষ পারদর্শী একজন অভিজ্ঞ মানুষ। তথ্য বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা যে কোনো মন্ত্রণালয়ের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম।দুঃখজনক হলেও সত্য, বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সরকার নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের সার্কুলার দিলে ১৫ থেকে ২০টি রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবি সংগঠন থেকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে তার নাম প্রস্তাবাকারে পাঠানো হয়।প্রস্তাব পাঠালেও বয়স ৫০ হয়নি বলে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রেসিডেন্ট হতে যেখানে বয়স লাগে ৩৫ এবং প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হতে গেলে ন্যূনতম ২৫ বছর হলেই হয়, সেখানে নির্বাচন কমিশনার হতে ৫০ লাগবে কেন? হাসিনার আমলের আইন দিয়ে কেন এই নিয়োগ? কেন আগে আইন সংস্কার করা হলো না? সংস্কার কমিশনের কাজ শেষ না হতে হঠাৎ করে কেন এই নিয়োগ?এসব বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, ‘আমি এসব কথা বাইরে বলতে চাই না। কারণ, আমি মনে-প্রাণে এই সরকারকে অউন করি। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, শত্রুপক্ষ জুলাই বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলোতে আমার কর্মকান্ড কোনোভাবেই থামাতে না পেরে গুজব ছড়িয়ে দেয়, আমি নাকি হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া গুলিতে মারা গিয়েছি। অসংখ্য মানুষ আমার বাসায় আসে লাশ দেখতে। আমার অফিসসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে অনাকাঙ্খিত ফোন আসে। তাছাড়া, আমি বিভিন্ন সময়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে যা বলছি, লিখছি এবং কোটা সংস্কার রিটের পিটিশনার হিসেবে আমার পরিচিতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় আমার মনে ক্রমশঃ নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে দুঃশ্চিন্তা, উদ্বেগ, উৎকন্ঠা তৈরি হচ্ছে।’
জুলাই বিপ্লবের সূত্রপাত যেখান থেকে, সেই কোটা সংস্কার রিট পিটিশনারদের নেতা ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের আসল রূপকারকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মূল্যায়ণ করলে দেশ এগিয়ে যাবে বলে মনে করেন তার শিক্ষক ঢাবির সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রবীণ অধ্যাপক ও সাবেক প্রক্টর ড. এএসএম আতীকুর রহমান, সাবেক পরিচালক ও সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. নুরুল ইসলাম ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী, জাতীয় মানবাধিকার সোসাইটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম তামিজী, মহাসচিব ব্যারিস্টার আফতাব উদ্দিন আহমদ প্রমুখ।এখনও সময় আছে। দ্রুত উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠনের মাধ্যমে তাকে মূল্যায়ণের দাবি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মহল থেকে উঠে এসেছে। গত ২১শে ফেব্রুয়ারি সিদ্ধিরগঞ্জের সাহেবপাড়ায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এমনই দাবি করেন গণ অধিকার পরিষদের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মুখপাত্র ফারুক হাসান, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার রিটের অন্যতম পিটিশনার, ঢাবির সাবেক ছাত্র আনিসুর রহমান মীর, স্থানীয় শিক্ষানুরাগী আলহাজ্ব বেল্লাল হোসেনসহ অন্যান্যরা। দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, পাঠ্যপুস্তক না দিতে পারাসহ নানা বিষয়ে সরকার সমালোচনা এড়াতে ও বঞ্চিতদের আহাজারি কমাতে কোটা আন্দোলনের রূপকারকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের সাহসী পদক্ষেপ বলে মনে করেন অনেকেই।